বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০১৭

জাবের (রা:)-এর মেহমানদারী ও রাসূ্ল (সাঃ)-এর মুজিযা

জাবের (রা:) বলেন, খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল, পরিখা খননকালে একটি শক্ত পাথর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা আমি নিজেই খন্দকের মধ্যে নামব। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন, সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল।আর আমরাও তখন তিনদিন পর্যন্ত কিছু খেতে পায়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির উপর আঘাত করলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়।
জাবের (রা:) বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকটে এসে বললাম, ‘তোমার কাছে খাওয়ার কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম। তখন সে একটি চামড়ার পাত্র হতে এক ছা‘পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরীর বাচ্চা ছিল। তা আমি যবেহ করলাম আর আমার স্ত্রী যব পিষল। অবশেষে আমরা হাঁড়িতে গোস্ত চড়ালাম।
অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে চুপে চুপে বললাম, ‘আল্লাহ্‌র  রাসূলুল্লাহ(সাঃ)!  আমরা একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করেছি। আর এক ছা’যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। সুতরাং আপন আরো কয়েকজন সঙ্গে নিয়ে চলুন।


রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উচৈচঃস্বরে সবাইকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারীগণ! এস তোমরা তাড়াতাড়ি চল, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরী করেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, ‘তুমি বাড়ী ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোস্তের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না। এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হলেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরগুলি রাসূলের সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দোআ করলেন।
অতঃপর ডেকচির নিকট অগ্রসর হয়ে তাতেও লালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দোআ করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্ত্ততকারিণীদের ডাক, যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারী নিয়ে পরিবেশন কর’।
জাবের (রা:) বলেন, ‘ছাহাবীদের সংখ্যা ছিল এক হাযার। আমি আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারী ফুটতেছিল এবং প্রথম অবস্থার ন্যায় আটার খামির হতে রুটি প্রস্তুত হচ্ছিল’ (মুত্তাফাকুন আলাই, মিশকাত হা/৫৮৭৭ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’অধ্যায়, ‘মু‘জিযা’অনুচেছদ) ।

শিক্ষা:

১. কর্মীদের উৎসাহ ও প্রেরণা দানের জন্য নেতাকে তাদের সাথে যে কোন কাজে নিজ হাতে সহযোগিতা করা।
২. কর্মীদের অন্যতম কর্তব্য হল নেতার সার্বিক বিষয়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পক্ষ হতে প্রকাশিত প্রত্যেক মুজিযার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা।

৪. দ্বীনের পথে যত কষ্টই আসুক না কেন হাসিমুখে তা বরণ করে নেওয়া।
Read More »

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

হাদিসের গল্প – মদীনায় হিজরতের পথে

বারা ইবনু আযেব (রা:) তাঁর পিতা হ’তে বর্ণনা করেন যে, একদা আযেব (রা:) আবূ বকর (রা:)-কে বললেন, হে আবূ বকর! যে রাতে আপনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে (হিজরতের উদ্দেশ্যে) সফর করেছিলেন, সে রাতে আপনারা কি করেছিলেন আমাকে অবহিত করুন। আবূ বকর (রা:) বললেন, আমরা একদিন এক রাত পথ চলার পর যখন দ্বিপ্রহর হ’ল এবং পথ-ঘাট এমন শূন্য হ’ল যে, কাউকেও চোখে পড়ছিল না। এমন সময় একটি লম্বা পাথর আমাদের নযরে আসল। তার পাশে যথেষ্ট ছায়া ছিল। সেখানে রোদ পড়ত না। আমরা সেখানে অবতরণ করলাম এবং আমি নিজ হাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য কিছু জায়গা সমান করলাম, যাতে তিনি শয়ন করতে পারেন।
এরপর একটি চাদর বিছিয়ে দিয়ে তাঁকে বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি ঘুমান। আমি আপনাকে পাহারা দিচ্ছি ও সবদিক খেয়াল রাখছি। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে আমি বের হয়ে চতুর্দিক থেকে তাকে পাহারা দিতে থাকলাম। তাঁকে পাহারা দেওয়ার সময় হঠাৎ দেখি একজন মেষচারক আমাদের ন্যায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পাথরটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বকরীগুলিতে দুধ আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি কি তা (আমাদের জন্য) দোহন করবে? সে বলল, হ্যাঁ। অতঃপর সে একটি বকরী ধরে এনে একটি পাত্রে সামান্য দুধ দোহন করল। আমার নিকট একটি পাত্র ছিল, যা আমি রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর জন্য এনেছিলাম, যেন তা দিয়ে তিনি তৃপ্তি সহকারে পানি পান করতে এবং ওযূ করতে পারেন। অতঃপর আমি দুধ নিয়ে রাসূলুল্লাহ(সাঃ)-এর নিকটে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগানো ভাল মনে করলাম না।
কিছুক্ষণ পরে তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় পেলাম। তখন দুধ ঠান্ডা করার জন্য তাতে পানি মিশালাম, ফলে দুধের নিম্নভাগ পর্যন্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! পান করুন। তিনি পান করলেন। এতে আমি খুব সন্তুষ্ট হলাম।


অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হয়েছে কি ? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আবূ বকর (রা:) বলেন, সূর্য ঢলে যাওয়ার  পর  আমরা  রওয়ানা  হলাম।  এদিকে  সুরাকা  ইবনু  মালেক আমাদের অনুসরণ করছিল। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ)! আমাদের নিকটে শত্রু এসে পড়েছে। তিনি বললেন,চিন্তা কর না, আল্লাহ্‌  আমাদের  সঙ্গে  আছেন’ (তওবা  ৪০)।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সুরাকার জন্য বদদোআ করলেন, ফলে তার ঘোড়াটি তাকে নিয়ে শক্ত মাটিতে পেট পর্যন্ত  দেবে গেল। তখন সুরাকা বলল, ‘আমার বিশ্বাস তোমরা আমার জন্য বদদোআ করেছ। তোমরা আল্লাহ্‌র  নিকট আমার জন্য দোআ কর, আল্লাহ্‌ তোমাদের সাহায্যকারী হবেন। আমি তোমাদের নিকট অঙ্গীকার করছি যে, তোমাদের অন্বেষণকারীদেরকে (শত্রুদের) আমি ফিরিয়ে দিব। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার জন্য দোআ করলে সে মুক্তি পায়। অতঃপর যার সাথেই সুরাকার দেখা হয়েছে, তাকেই সে বলেছে, ‘আমি তোমাদের কাজ সেরে এসেছি। এদিকে তারা কেউ নেই। এমনিভাবে যার সাথেই তার সাক্ষাৎ হত, তাকেই সে ফিরিয়ে দিত ।
[ বুখারী হা/৩৬১৫, মুসলিম হা/২০০৯, মিশকাত হা/৫৮৬৯ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’অধ্যায়; ‘মুজিযা’অনুচেছদ ]

শিক্ষা:

১. সর্বক্ষেত্রে যথাযথভাবে নেতার আনুগত্য করা। প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত থাকা।
২. বিশেষ ক্ষেত্রে মহৎ ব্যক্তিগণকে ঘুম থেকে না ডাকা বিচক্ষণতার পরিচয়।
৩. যে কোন বিপদে একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র প্রতি অবিচল আস্থা রাখা।

৪. আল্লাহ্‌ তাআলা শত্রু বা যালেমদেরকে অনেক সময় প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে থাকেন।

Read More »

রবিবার, ৫ মার্চ, ২০১৭

আবূ নাজীহ (রা:)-এর ইসলাম গ্রহণ

আবূ নাজীহ আমর ইবনু আবাসাহ আস-সুলামী (রা:) বলেন, জাহেলী যুগ আমি ধারণা করতাম যে, লোকেরা পথভ্রষ্টতার উপর রয়েছে এবং এরা কোন ধর্মেই নেই। আর ওরা প্রতিমা পূজা করছে। অতঃপর আমি এক ব্যক্তির ব্যাপারে শুনলাম যে, তিনি মক্কায় অনেক আশ্চর্য খবর বলছেন। সুতরাং আমি আমার সওয়ারীর উপর বসে তাঁর কাছে এসে দেখলাম যে, তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ)।
তিনি গোপনে (ইসলাম প্রচার করছেন), আর তাঁর সম্প্রদায় (মুশরিকরা) তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করছে। সুতরাং আমি বিচক্ষণতার সাথে কাজ করলাম। আমি মক্কায় তাঁর কাছে পরামর্শ করলাম। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, আপনি কে?
তিনি বললেন, ‘আমি নবী’।
আমি বললাম, নবী কি?
তিনি বললেন, ‘মহান আল্লাহ্‌ আমাকে প্রেরণ করেছেন।
আমি বললাম, তিনি কি দিয়ে প্রেরণ করেছেন?
তিনি বললেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা,মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা, আল্লাহ্‌কে একক উপাস্য মানা এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার নির্দেশ দিয়ে।
আমি বললাম, এ কাজে আপনার সঙ্গে কে আছে?
তিনি বললেন, ‘একজন স্বাধীন এবং একজন কৃতদাস। তিনি বলেন, তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তার মধ্যে তখন তাঁর সঙ্গে আবূ বকর ও বেলাল (রা:) ছিলেন।
আমি বললাম, ‘আমিও আপনার অনুগত।
তিনি বললেন, ‘তুমি এখন এ কাজ কোন অবস্থাতেই করতে পারবে না। তুমি কি আমার অবস্থা ও লোকদের অবস্থা দেখতে পাচ্ছ না? অতএব তুমি (এখন) বাড়ি ফিরে যাও। অতঃপর যখন তুমি আমার জয়ী ও শক্তিশালী হওয়ার সংবাদ পাবে, তখন আমার কাছে এস।



সুতরাং আমি আমার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় চলে এলেন। আর আমি পরিবারের সদস্যদের সাথেই ছিলাম। অতঃপর আমি খবরাখবর নিতে আরম্ভ করলাম এবং যখন তিনি মদীনায়  আগমন  করলেন,  তখন  আমি  (তাঁর  ব্যাপারে)  লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। অবশেষে আমার নিকট মদীনার কিছু লোক এলো।
আমি বললাম, ঐ লোকটার অবস্থা কি, যিনি (মক্কা ত্যাগ করে) মদীনায় এসেছেন?
তারা বলল, লোকেরা তাঁর দিকে দ্রুত ধাবমান। তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিল; কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হয়নি।
অতঃপর আমি মদীনায় এসে তাঁর খিদমতে হাযির হলাম। তারপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ)! আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তো ঐ ব্যক্তি, যে মক্কায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলে।
আমি  বললাম,  হ্যাঁ। হে  আল্লাহ্‌র   রাসূল  (সাঃ)!  আল্লাহ্‌ তাআলা আপনাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যা আমার অজানা, তা আমাকে বলুন? আমাকে ছালাত সম্পর্কে বলুন।
তিনি বললেন, তুমি ফজরের ছালাত পড়। তারপর সূর্য এক বল্লম পরিমাণ উঁচু হওয়া পর্যন্ত বিরত থাক। কারণ তা শয়তানের  দু’শিং-এর মধ্যভাগে উদিত হয় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং সে সময় কাফেররা তাকে সিজদা করে। পুনরায় তুমি ছালাত আদায় কর। কেননা ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন, যতক্ষণ না ছায়া বল্লমের সমান হয়ে যায়। অতঃপর ছালাত থেকে বিরত হও। কেননা তখন জাহান্নামের আগুন উস্কানো হয়। অতঃপর যখন ছায়া বাড়তে আরম্ভ করে, তখন ছালাত আদায় কর। কেননা এ ছালাতে ফেরেশতা সাক্ষী ও উপস্থিত হন। পরিশেষে তুমি আছরের ছালাত আদায় কর। অতঃপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত ছালাত আদায় করা থেকে বিরত থাক। কেননা সূর্য শয়তানের দু’শিং-এর মধ্যে অস্ত যায় (অর্থাৎ এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে) এবং তখন কাফেররা তাকে সিজদা করে।
পুনরায় আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র নবী (সাঃ)! আপনি আমাকে ওযূ সম্পর্কে বলুন?
তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ পানি নিয়ে (হাত ধোয়ার পর) কুলি করবে এবং নাকে পানি নিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করবে, তার চেহারা, তার মুখ এবং নাকের গুনাহসমূহ ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন আল্লাহ্‌র আদেশ অনুযায়ী তার চেহারা ধৌত করে, তখন তার চেহারার পাপরাশি তার দাড়ির শেষ প্রান্তের পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার হাত দু’খানি কনুই পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার হাতের পাপরাশি তার আঙ্গুলের পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর সে যখন তার মাথা মাসাহ করে, তখন তার মাথার পাপরাশি চুলের ডগার পানির সাথে ঝরে যায়। তারপর সে যখন তার পা দু’খানি গিট পর্যন্ত ধৌত করে, তখন তার  পায়ের  পাপরাশি  তার আঙ্গুলের পানির সাথে  ঝরে  যায়। অতঃপর সে যদি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করে, আল্লাহ্‌র প্রশংসা ও তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে, যার তিনি যোগ্য এবং অন্তরকে আল্লাহ্‌ তাআলার জন্য খালি করে, তাহলে সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে বেরিয়ে আসে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল।
তারপর আমর ইবনু আবাসাহ (রা:) এ হাদীছটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ছাহাবী আবূ উমামা (রা:)-এর নিকট বর্ণনা করলেন।
আবূ উমামাহ (রা:) তাঁকে বললেন, ‘হে আমর ইবনু আবাসাহ! তুমি যা বলছ, তা চিন্তা করে বল!  একবার ওযূ করলেই কি এই ব্যক্তিকে এতটা মর্যাদা দেওয়া হবে? আমর বললেন, হে আবূ উমামাহ! আমার বয়স ঢের হয়েছে, আমার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার মৃত্যুও নিকটবর্তী। (ফলে এ অবস্থায়) আল্লাহ্‌ তাআলা অথবা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করার কি প্রয়োজন আছে? যদি আমি এটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে একবার, দুবার, তিনবার এমনকি সাতবার পর্যন্ত না শুনতাম, তাহলে কখনোই তা বর্ণনা করতাম না। কিন্তু আমি তার নিকট এর চেয়েও অধিকবার শুনেছি’ (মুসলিম হা/৮৩২, ‘মুসাফিরের ছালাত’অধ্যায়)।


শিক্ষা:

১. দ্বীনী বিষয় জানার জন্য আগ্রহ থাকতে হবে।
২. পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আউয়াল ওয়াক্তে আদায় করতে হবে।
৩. ওযূর মাধ্যমে বান্দা তার পাপরাশি মোচন করে নিতে পারে।

Read More »

বুধবার, ১ মার্চ, ২০১৭

গরু

‘গরু ম্যানেজ হয় নি -’ খবর পেতেই আর বিন্দু মাত্র দেরী না করে আনন্দস্পটে চলে আসলাম ।
যুবরাজ সিং-এর মত করে নাকটা আকাশের দিকে তুলে দাঁড়িয়ে ছিল ফারহান ।
মনটা চাইল নাকের ওপর একটা বিরাশি ছক্কার ঘুষি বসিয়ে ফারহানটাকে চ্যাপ্টা করে ফেলতে । কিন্তু আজকের এই বিশেষ আনন্দের দিনটা নষ্ট করতে চাইলাম না ।
‘ফান্ডের টাকা দিয়ে Galaxy S4 কে কিনেছিল চাঁদ ?’ মনে মনেই হুংকার ছাড়লাম ।
তবে এখন আত্মকলহের সময় নয় ।
সামনে ঘোরতর সমস্যা । একেবারে ‘ইজ্জাত কি সাওয়াল’!
দেখলাম কসাইও প্রস্তুত । আট দশেক রকমের ছুড়ির মাথা ধারালো করছে কসাই মামা আর তার অ্যাসিস্ট্যান্টদ্বয় ।
আস্ত গরু জবাই করে প্রেমসে খাওয়া-দাওয়ার আমেজটাই নষ্ট হয়ে গেল দিনের শুরুতেই !
আজ আমাদের ক্লাবের বর্ষপূর্তি ।
জিনিসটা শুরু হয়েছিল ঠিক এক বছর আগে ।
*
রাজশাহী জুড়ে রাস্তার পাশে আড্ডা দিতে দিতে ক্লান্ত তখন আমরা সবাই ।
‘দেশ রসাতলে গেল !’ বিজ্ঞের মত বলে উঠেছিল কাফি ।
‘বলে যা ... বলে যা ... ’ টিটকিরির সুরে তাল মেলায় ফারহান । ‘সবার অভিযোগ দেশ রসাতলে গেল । কিন্তু এক পা আগানোর বেলায় সব অকর্মার ঢেঁকি ।’
‘ছেড়ে দে ।’ মধ্যস্থতায় আসতেই হল আমাকে, ‘ছেলেমানুষ । কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে !’
‘ছেলেমানুষ!’ হুংকার দিয়ে উঠল কাফি, ‘এই বছরেই সবাই তো রীতিমত আঠারোয় পা দিয়েছিস ! তবুও ছেলেমানুষ ?’
‘তো কি হয়েছে?’ পাশ থেকে মিনমিন করে বলল রাইয়ান, ‘মেয়েমানুষ তো বলেনি ।’
‘তোদের জন্যই দেশের আজ এই দশা ।’ দেশমাতৃকার প্রেমে বিগলিত তখন কাফি, ‘আজ এই টগবগে তরুণদের রক্ত যদি শীতল না হত – বয়লারের মুরগি খেতে খেতে যদি এরা মুরগি না হত – তবেই বুঝত এরা – এই দেশের জন্য তাদেরও দায়িত্ব আছে বৈকি ! যুবসমাজ – এই মুহূর্ত থেকে দেশসেবায় নিয়োজিত হও । আহবান জানালাম উদারচিত্তে ।’
‘উদরপূর্তির পরে এ নিয়ে আলোচনা করলে আমাদের মাথা খুলবে ভালো ।’ একমত হয়ে গেলাম নিমেষেই । ‘ওই যে একটা চটপটির দোকান ।’
‘হ্যাঁ, ওইটা একটা চটপটির দোকান ।’ সায় জানাল কাফি । ‘সে তো আমিও দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু খাওয়াচ্ছেটা কে, শুনি?’
‘নির্ঘাত তুই ।’ সমঝোতা করে দিল ফারহান, ‘উদারচিত্তে এবার চটপটির দোকানের দিকে হাঁটা দাও বাছা ।’
দোকান থেকে আধ ঘন্টা পর যখন আমরা চলে যাচ্ছি - কাফির পকেটের দীর্ঘশ্বাস এতদূরে থেকেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম বলে মনে হল ।
ওর উদার মন রাতারাতি সংকীর্ণ হয়ে গিয়ে দেশসেবার ভূত বেড়িয়ে যাবে বলেই ভেবেছিলাম ।


কিন্তু না ।
দমে যাওয়ার ছেলেই সে নয় ।
রীতিমত একটা ঘর ভাড়া নিয়ে খুলে ফেলল ‘মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘ’ । আর আমাদের সেখানে চাঁদা দিয়ে মেম্বার হতেই হল । ভেবেছিলেম পাড়ায় রীতিমত টিটকিরি পরে যাবে এই নিয়ে ।
কে বলেছে ‘মানুষ ভাবে এক – আর হয় আর এক?’
সেদিন স্বঘোষিত ইতিহাসবেত্তা জহির চাচাকে দেখে বেশ লম্বা একটা সালাম ঠুকে দিতেই একগাল হাসলেন তিনি ।
‘আরে ইমন যে !’ একপাশে পানের পিক ফেলে আবারও তরমুজের বিচির প্রদর্শনী মেলে দিলেন তিনি । ‘সমাজসেবা কেমন হচ্ছে?’
‘ভালই চলছে চাচা ।’ মুখ রক্ষার খাতিরে বলতেই হল । হচ্ছে তো ঘোড়ার ডিম । কাফি রোজ এক থেকে দেড় ডজন করে আইডিয়া বের করে কি করলে আজ জাতির মুক্তি হবে । কিন্তু কাজের বেলায় ঠনঠন । হবেই বা না কেন ? কর্মসূচীর বেশির ভাবই ‘অনন্ত জলীলের কাজ’ ;
যেমন - একটি কর্মসূচি হল পার্লামেন্টের সামনে আমরণ অনশনে নামা । যতদিন গার্মেন্টস শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ বেতন দেওয়ার অঙ্গীকার না করা হবে ততদিনের জন্য আহার-পানীয় নিষিদ্ধ । এদিকে বাহিনীতে আমরা পাঁচ জন । বলিহারী যেতেই হল ।
‘সে তো বুঝতেই পারছি বাছা ।’ আনন্দে মাথা দোলালেন জহির চাচা । ‘যতই দিন যাচ্ছে তোমার চেহারা চেঙ্গিস খানের মত হচ্ছে । চেন তো ? ইতিহাস বিখ্যাত সমাজসেবক । ইতিহাস পড়বে, বুঝেছ ? অনেক কিছু জানার আছে । শেখার আছে ।’
চেঙ্গিস খান আর সমাজসেবা !!
আমাদের ক্লাবের প্রতি সমাজের ধারণায় কোনদিক থেকেই উৎফুল্ল হতে পারলাম না ।
তবে কাফির একটা প্ল্যান অন্তত হিট !
‘সুসাস্হ্য এবং সুন্দর মনের জন্য চাই খেলাধুলো এবং ব্যায়াম ।’ একদিন এই অভিনব সমীকরণ আসে ওর মাথায় ।
ক্লাবে ক্যারাম বোর্ড – কার্ড জোন আর জিম সংযোজন করতেই হুড় হুড় করে পাড়ার ছেলেপিলের আগমন ঘটতে থাকল এবং তাদের পকেট থেকে চাঁদার টাকাও বের হতে থাকল বৈকি !
মেম্বারশিপ ছাড়া কাওকেই ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয় এবং মেম্বারশিপ মানেই মাসিক চাঁদার অব্যাহত ধারা – সুস্পষ্ট কথা কাফির ।
তরুণ সমাজের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল আমাদের ক্লাব । সমাজসেবা বলে কথা !
তবে সমাজে নিন্দুক থাকবেই ।
‘পাড়ার ছেলেপুলেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে’ আমাকে শুনিয়েই চায়ের দোকানে দোকানদারের সাথে আলাপ জুড়ে দিলেন জহির চাচা, ‘ তায় আবার নেপোলিয়ন আর চেঙ্গিস এক হয়েছে ! সারাদিন আমার পল্টুটা ক্লাবে গিয়ে পড়ে থাকে । দিন দিন ব্যায়াম করে করে গুন্ডা হচ্ছে !’
এরপর আর বসা চলে না । দাঁত কিড়মিড় করতে করতে উঠে পড়লাম ।
‘চেঙ্গিস আর নেপোলিয়ন ? গুন্ডা হচ্ছে ? নাহয় পাড়ার ছেলেগুলো এখন চিত্তাকর্ষতার ধাপে আছে – তাতেই নিন্দুক এতবড় অপবাদ রটালো ?’ চোখমুখ লাল করে বলল কাফি, ‘দ্বিতীয় ‘আনন্দমেলা’ ধাপের পরই তো আমরা সমাজসেবার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাব সে কি তারা বোঝে না !’
ফারহান একটা করে সবাইকে আইসক্রীম কিনে খাইয়ে পরিবেশ ঠান্ডা করল – অবশ্যই মেম্বারের চাঁদার টাকায় । সমাজসেবীদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হয় বৈকি !


বন্যার বেগে মেম্বারদের সংখ্যা বাড়তে থাকল । ততদিনে মেম্বারদের জন্য অন্য যেকোন জায়গা থেকে হাফ-চার্জে একটা সাইবার ক্যাফেও খোলা হয়েছে কি না ! পাড়ার সীমা লংঘন করে আশে পাশের এলাকার ছেলেছোকড়ারাও দিব্যি জুটে গেল মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘে । আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে আট মাসেই একশ ছাড়িয়ে গেল মেম্বারদের সংখ্যা !
ততদিনে এক বছরও হয়ে গেছে প্রায় ।
এক বছর পূর্তির জন্য একটা ছোটখাট ভোজের ব্যাবস্থা করা আমাদের নীতিগত দায়িত্ব মনে করলাম ।
রীতিমত হই-হুল্লোড় কারবার করতেই হবে ।
গরু থেকে মুরগি সবই স্পট ডেড বানিয়ে রান্না হবে । মানে ঘটনাস্থলেই জবেহ ।
সবই ঠিক ছিল ।
ফান্ডের টাকা কোথায় যায় !! – এই নিয়ে মেম্বারদের মনের চাপা অসন্তোষও ঘুঁচিয়ে দেওয়া যেত এই সুযোগে ।
ফান্ড উলটে পালটে দেখা গেল ভালোই আছে ।
ফারহান ছিল তখন ঢাকায় । প্ল্যান সামলে আমরা সবাই দুইদিনের ছুটি নিলাম । সামনে বড় প্ল্যান-প্রোগ্রামের ব্যাপার স্যাপার আছে । ব্যস্ততম (!) এক বছর শেষে অবশ্যই আমাদের দেহ ছুটির দাবীদার ।
ফারহানকে ফোনে জানানো হল, ‘সারপ্রাইজিং খবর আছে ।’
ওপাশ থেকে সেও গর্বের সাথেই জানাল ‘আমার কাছেও একই জিনিস আছে ।’
প্রত্যেকেই নতুন কিছু করার আনন্দে তখন উৎফুল্ল ।
*
পরবর্তী কার্যদিবসে উপস্থিত হয়েই রাইয়ান জানাল, টাকা ‘গন’ ।
আমরা সবাই বর্জ্রাহত হতেই ফারহান হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানাল , ‘নট গন । ইনভেস্টেড । ’
টেবিলের ওপর একটা Galaxy S4 রেখে বলল, ‘আমাদের ক্লাবের জন্য একটা মোবাইলফোন দরকার ছিল । বার বার সিম খুলে চিমটিয়ে আর কতদিন ?’
সবসময় মাথা গরম কাফির হাত চলে গেল হোলস্টারে । পিস্তলটা বের করেই ম্যাগাজিন খালি করে দিল ও ফারহানের বুকে । অবশ্য কল্পনাতেই । মেজাজ খারাপ হলেই হোলস্টারে হাত দেয়ার মত একটা মুভ দিলেও সেখানে তার কোনকালেই হোলস্টার ছিল না ।
‘ওহে শ্যালক !’ মধুর সম্বোধন করল রাইয়ান । ‘আমাদের প্ল্যান ছিল আরেকটা ।’
পুরো প্ল্যান খুলে বলা হল ওকে । রীতিমত ঠোঁট বাঁকিয়ে আমির খান মার্কা গলায় ফারহান তার মূল্যবান মন্তব্য জানাল, ‘ইগনার কার ! ইগনার কার !!’
‘সম্ভব না শ্যালিকার স্বামিপ্রবর !’ পুনরায় মধুর ভাষা প্রয়োগ করল রাইয়ান । ‘সবাইকে গত অধিবেশনেই নিমন্ত্রণ করে দেওয়া হয়েছে ।’
‘হেহ – মাত্র ষাট হাজার তো ! বল দেখিনি কি বাদ যাচ্ছে খাবারের আইটেম থেকে তাহলে?’
‘গরু!!’ একযোগে হাঁক ছাড়লাম আমরা ক্ষোভে ।
‘চিল, ম্যান ।’ আকাশে ইদানিং চিল না থাকলেও আমাদের ম্যানদের এই কথা বলেই থাকে ফারহান । ‘গরু আমি ম্যানেজ করব ।’
তবে গরু বেশ ভালোভাবেই ম্যানেজ হয়েছে দেখলাম । গরুর বাজেটের সাথে সাথে আমাদের ইজ্জতও ‘গন’ ।
যুবরাজ সিং-এর মতই – যার ভাব দেখলে নাক-মুখ সমান করার অভিপ্রায় জেগেই থাকে - সানগ্লাস চোখে নাক আকাশের দিকে দিয়ে এখন সামনেই ফারহান ।
‘কাফি জানে?’ ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম ।
‘হুঁ’ এক কথায় জবাব দিল ফারহান ।
‘তোর ভূত ছুটায়নি গালি দিয়ে?’
‘না’ আবারও এককথায় । যেন ল্যাবের কুইজ দিচ্ছে । না-বাচক উত্তর দিলেও কুইজ কুইজ ভাব দেখেই যা বোঝার বুঝে ফেললাম ।
চারপাশে তাকালাম । মেম্বারদের ছড়াছড়ি সবখানেই । পরিস্থিতি মাথা কাটার মত হওয়ার আগেই কেটে পড়তে হবে এখান থেকে । সোজা নানার বাড়ি ।
কসাই মামা এখনও ছুড়ি ধার দিচ্ছে । গরুর লোভে অনেকেই এসেছে আজ এখানে । মেম্বারশিপের চাঁদার একটা গতি হল ভেবেই তারা খুশি । আর যদি গরু না পায় তবে ওই ছুড়ির ব্যাবহার কোথায় হতে পারে অনুমান করে হনুমান হয়ে গেলাম ।
আফটার অল, জিম করে করে এদের গুন্ডাসদৃশ বডি-বিল্ডিং-এর পথ আমরাই দেখিয়েছি বৈকি । এই প্রথমবারের মত জহির চাচার কথা সত্য বলে মনে হচ্ছিল একটু একটু ।
ভাবনার ছেদ কেটে গেল কারও হুংকারে –
‘আরে ধর ! ধর ! কাট ! কেটে ফেল !’
এবং সেই সাথে ঘোড়ার খুরের টগবগানি ।
তাজ্জব কান্ড ! এখানে ঘোড়া আসবে কোত্থেকে !!
আমাদের চিটিং বাজি তাহলে মেম্বাররা টের পেয়ে গেলই শেষ পর্যন্ত ?
একেবারে ঘোড়সওয়ার হয়ে আমাদের কাটতে এসেছে নিশ্চয় ?
*
লেজ উড়িয়ে – শিং নাড়িয়ে ছুটে আসা গরুটাকে দেখেই আমার ভুল ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল ।
মুহুর্তের জন্য জনতা থমকে গেলেও একযোগে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল গরুর ‘পোলার’ ওপর ।
গরু নিমেষেই ধরাশায়ী ।
কসাই আর তার অ্যাসিস্টেন্টদ্বয় এতক্ষণে হাত চালানোর সুযোগ পেয়ে আর দেরী করল না ।
কেবল আমারই একটু খটকা লাগল, কাফির পাশে দিয়ে বিড় বিড় করে বললাম, ‘গরুটা অনেকটা জহির চাচার কালো গাইটার মত না?’
আগুন চোখ নিয়ে কাফির হুংকার, ‘আরে কাটলে সব এক ! কাট ! কাট !! থমকে গেলি ক্যান তোরা ? আল্লাহু আকবর !’
সেটাই ! ভাবলাম । চেঙ্গিস খান আর নেপোলিয়ন !! দাঁড়াও তোমাকে ইতিহাসের প্রায়োগিক শিক্ষা দিচ্ছি । চেঙ্গিসের স্বভাব কেমন ছিল জেনে নাও ... হুঁ হুঁ !!
*
সেদিনই সন্ধ্যা । মেম্বাররা সব তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেছে বাসায় ।
আমরা পাঁচজনই কেবল অফিসে ।
‘গরু ম্যানেজ করলি কি করে ?’ চোখ আকাশে তুলে জানতে চাইল রাইয়ান ।
‘রাস্তার পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছিল । দেখেই প্ল্যানটা মাথায় আসে । বাইরের পাড়ার দুই চারজন মেম্বারের কাছে ছড়িয়ে দিলাম গরু গেছে ছুটে । ত্রিমুখী ধাওয়া দিয়ে বাকিটুকু করা তো সহজ । ’
‘বাবারা ব্যাস্ত? ’ ভূত দেখার মত চমকে দেখলাম স্বয়ং জহির চাচা উপস্থিত ! নির্ঘাত বুঝে নিয়েছে !!
পকেট থেকে ফোন বের করে অযথায় রিসিভ করার ভান করে চেঁচিয়ে উঠল রাইয়ান, ‘কি বললা ? ভাইয়া অ্যাকসিডেন্ট করেছে? আমি এক্ষুণি আসছি । ’
অতঃপর ঝড়ের বেগে প্রস্থান ।
‘আমি একটু বাথরুমে - ’ বাক্য শেষ না করেই হাওয়া ফারহানও ।
দুই গোবেচারা বান্দা আমি আর কাফি তখন ।
‘বসুন। বসুন !!’ হঠাতই ব্যাগ্র হয়ে উঠলাম আমরা ।
‘ইয়ে ...’ করুণ কন্ঠে শুরু করলেন জহির চাচা । ‘সমাজসেবার নামে খাওয়া দাওয়া ফূর্তি করে তোমাদের হাড়ে মরচে পড়ে গেছে বুঝতে পারছি । তাই আমার গরুর-’
‘আমরা দাম দিয়ে দেব !!’ হড়বড় করে বললাম আমরা ।
‘কি হল তোমাদের ?’ ভুরু কুঁচকালেন চাচা, ‘বলছিলেম আমার গরু আজ রাতে বাসায় ফেরে নি । তোমরা কি একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখবে ? কিসের দাম দিতে চাচ্ছিলে তোমরা ?’
‘না চাচা , মানে সমাজসেবা -’ আমতা আমতা করলাম আমি ।
‘- সমাজসেবার নামে খাওয়া দাওয়ার মূল্য আমরা শোধ দেব আপনার উপকারে এসে’ বাক্য সম্পূর্ণ করে দিল কাফি । ‘চল বেরোই’ আমাকে টান দিল ও । ‘আপনি চিন্তা করবেন না চাচা । গরু আশেপাশেই আছে হয়ত ।’
অমায়িক হাসি দিলেন জহির চাচা ।
আর আমার পেট রীতিমত গুড়গুড় করে উঠল ।
আশে পাশেই বৈকি ! আমার আর কাফির পেটেই আছে বেশ একটা অংশ । আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই দুই কিলোমিটারের মধ্যেই বাসায় বাসায় তরুণসমাজের পেটে আছে বাকি গরু ।
‘ইয়ে চাচা?’ ডাক না দিয়ে পারলাম না , ‘আপনার তথ্যে একটা ভুল ছিল ।’
‘কি ভুল বাবা ?’
‘চেঙ্গিস খান ইতিহাসের পাতায় অমর বটে । তবে নৃশংসতার জন্য । সমাজসেবার জন্য নয় ।’
জহির চাচার মুখটা কেমন জানি ফ্যাকাসে হয়ে গেল ।
এর দুই মাসের মধ্যেই রীতিমত ব্যস্ততার সাথেই তুলে ফেলা হল গর্বিত মিরবাগ সমাজসেবী যুবসংঘকে ।

Read More »

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

বাংলাকে ভালোবাসি

সূর্যাস্তটা অসাধারণ লাগছে এখান থেকে দেখতে ।
সেদিকে হা করে তাকিয়ে থাকে জাফর । ওর চেহারার অবস্থা দেখে হেসে ফেলে তৃপ্তি ।
এবার তৃপ্তির সুন্দর হাসিমুখটার দিকে একই ভাবে তাকায় জাফর ।
‘জীবনে সূর্যাস্ত দেখেন নি ?’ হাসির আভা মুখে ধরেই বলে তৃপ্তি ।
একটু হেসে চেহারা স্বাভাবিক করে জাফর ।
‘সূর্যাস্ত ঠিক দেখার জিনিস না । ওটাকে খেয়ে ফেলতে হয় । তাই সূর্য খাচ্ছিলাম ।’
জাফরের কথায় মেয়েটা হেসে কুটিকুটি হয় ।
অথচ ওদের পরিচয় মাত্র চার ঘন্টার । সকালে শহীদ মিনারে গিয়েছিল আর দুপুরে তৃপ্তির সাথে দেখা ।
অনলাইন ম্যাগাজিনে লেখালেখি করে জাফর । পরে একক বইও বের করেছে । মাসিক ম্যাগাজিনগুলোও জাফরের লেখা পেলেই লুফে নেয় । তৃপ্তি মেয়েটা জাফরের ফ্যান হয়েছে ওখান থেকেই । ঠিক ফ্যান বলা উচিত না । এসি ।
জাফরকে বহু কষ্টে ফেসবুকে খুঁজে পেতে আর দেরী করে নি । দেখা করার জন্য আবদার করে বসেছে ।
কি মনে হতে যেন জাফর এই মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেয় না বাকি সবার মত । দেখা করতে এসেছে ও আজকে ।
‘চলুন, একটু হাঁটি ।’ আলতো করে বলে মেয়েটা ।
‘হুঁ ।’ দুই হাত পকেটে রেখে মেয়েটার পাশে পাশে হাঁটে জাফর ।
তৃপ্তি একেবারেই হঠাৎ জাফরের ডান হাত জড়িয়ে ধরে । জাফরের মাঝে অবশ্য এতে কোন ভাবান্তর হয় না ।
নদীর ধারে আজ অনেকেই এসেছে । ছুটির দিন আজ । একুশে ফেব্রুয়ারী ।
‘আপনার লেখাতে এত মানুষ মারেন কেন ?’ মেয়েটার প্রশ্নে ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে জাফর ।
‘কি জানি । চরিত্রদের যেখানে মরা লাগবে সেখানে আমি নগন্য জাফর আর কি করতে পারি বলুন ?’ রহস্যময় একটা কন্ঠ করে বলে লেখক ।
‘কি খারাপ ! নিজের দোষ এখন চরিত্রদের ঘাড়ে – তাই না ?’ আদুরে গলা দিয়ে রহস্যময় কন্ঠের প্রতিবাদ জানায় তৃপ্তি ।
একটু হাসে শুধু জাফর ।
কানা ফকিরটা কোথা থেকে এসে তৃপ্তির ফতুয়া ধরে খনখনে গলায় বলে, ‘টাকা দে রে মা । ভালো হবে তোর ।’
ফকিরটা চেহারা দেখেই আৎকে ওঠে তৃপ্তি । তেলাপোকাদর্শনের পর নারীকুল যেভাবে চিৎকার ছাড়ে সেভাবেই একটা হাঁক দেয় ও অজানা কারও উদ্দেশ্যে, তারপর কড়া গলাতে বলে, ‘জামা ছাড়ুন ! যত্তসব ফালতু মানুষ !’
জাফর অবশ্য ওয়ালেট বের করে ফেলেছে । কানাটার হাতে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট গুঁজে দিতেই অভিভূত হয়ে পড়ে ফকিরটা ।
‘বাবা, দোয়া চা । দোয়া চা ।’
‘সফল হতে পারি যেন ।’ বলে জাফর ।
তৃপ্তি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে । লেখক মানুষরা আধ্যাত্মিক ব্যাপারে বিশ্বাস করে না বলেই জানত ও । দেখা যাচ্ছে জানায় ভুল ছিল !
ওরা আবার হাঁটে একজোড়া সুখী পায়রার মত । অথবা একটি সুখী পায়রা ।
জাফরের মাথায় চিন্তার ভীড় জমেছে ।
বেশ পেছনের মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরেই ওদের ফলো করছে । ব্যাপারটা তৃপ্তিকে বলে ভয় পাইয়ে দিতে চায় নি জাফর ।
এই মেয়ে ওদের পেছনে পেছনে ঘুরছে কেন ?
জাফর বেশ খ্যাতি পেয়েছে মাত্র দুই বইমেলাতেই । ওর লেখা থ্রিলার ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের আর কোন লেখককে । সমসাময়িক তো বটেই – পূর্বসূরীদেরও । কাজেই ভক্ত-নারীভক্তের অভাব নেই ।
ফেসবুকেও জাফর বেশ অ্যাকটিভ । কাজেই ওর চেহারা বাংলাদেশের অনেকেই চেনে । তাদের কেউ কাছে এসে অটোগ্রাফ চায় । আবার যাদের সে সাহস হয় না জাফর বিরক্ত হবে ভেবে তারা দূর থেকে কিছুক্ষণ ফলো করে চলে যায় ।
জাফর এসব অনুভূতি বেশ উপভোগই করে । মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় না – তাও না ।
কিন্তু এই মেয়ের ফলো করার ধরণটা ভালো লাগছে না জাফরের ।
গত বছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে মিথিলা খুন হয়েছিল রহস্যজনকভাবে ।
একটা বছর মাথা ঘামিয়েছে জাফর – কিন্তু বের করতে পারে নি সেই রহস্য । আজ আবার একুশে ফেব্রুয়ারীতে একটা মেয়েকে ফলো করতে দেখলে একটামাত্র চিন্তাই আসা স্বাভাবিক – তৃপ্তি কি নিরাপদ ?
মিথিলাকে খুন করেছিল যে – সে কি এই মেয়েটাই ? জেলাস ?
তৃপ্তি কি কি জানি বকে চলেছে । ওর কথার দিকে মনোযোগ দেয় না জাফর । একটা সিগারেট ধরায় ।
আড়চোখে তাকিয়ে দেখে বেশ পেছনে আনমনে সূর্য দেখতে থাকার অভিনয় করা মেয়েটাও ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট বের করে ।
ভুল ভাবছে জাফর ? শুধুই ফ্যান ?
তাহলে ওর চোখের দৃষ্টিটাকে সুবিধের লাগছে না কেন ওর ?
‘ওহ মাই গড ! জাফর আহমেদ ! হি হিমসেলফ ! আই কান্ট বিলিভ মাই আইজ !’ চিল চিৎকারে ফিরে তাকায় জাফর ।
কিশোরী একটা মেয়ে ।
একহারা গড়ন । ফুলের মত চেহারা । এই মুহূর্তে ফুলটা বিস্ময়াভূত ।
‘আমি আপনার প্রতিটা লেখা পড়ি, জানেন ! ফেসবুকে, ব্লগে আর আপনার লেখা যে ম্যাগাজিনগুলো বের করে -’
তৃপ্তির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পারলে এই মেয়েটাকে কাঁচাই খেয়ে ফেলে !
তবে জাফর একটু হাসল শুধু । বিনয়ের হাসি ।
‘অতটা ভালোও কিন্তু লেখি না ।’ কোমল গলায় বলে ও তরুণীকে ।
‘ইশ ! আমি যদি আপনার মত ‘অতটা ভালো না’ গল্প লেখতে পারতাম !’ অবাক চোখে তাকিয়ে বলে কিশোরী, ‘আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন ? আমি অনীতা !’
ঝটপট একটা কলম ধরিয়ে দেয় ও জাফরকে ।
কিন্তু কাগজ কোথায় ?
কিশোরী শুধু নিজের জামার গলার নিচের অনাবৃত ফর্সা চামড়া দেখায় আঙ্গুলের ইশারায় । চোখে দুষ্টু হাসি ।
কলমের আলতো স্পর্শে একটা অটোগ্রাফ দিতেই হয় জাফরকে ।
অনীতা খুশিমনে চলে যাচ্ছে । চলে যাচ্ছে আর ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে জাফরের দিকে ।
কিন্তু জাফর ওদিকে তাকায় না আর ।
সিগারেট ফেলে দিয়ে পেছনের দিকে দৃষ্টি পড়তেই অবাক হয়ে যায় ও ।
সিগারেট ধরানো মেয়েটা নেই পেছনে কোথাও !


জাফরের বাসাতে ঢুকে নিজের ব্যাগটা আছড়ে ফেলে তৃপ্তি আরামদায়ক সোফাটার ওপর ।
মেয়েটার মেজাজ খারাপ জানে জাফর । শহরের বাইরে থেকে শুধু জাফরের সাথে দেখা করতেই এসেছিল ও – আজ রাত দশটাতে বাস ।
এখনও দুই ঘন্টা আছে । কাজেই সময়টুকু নিজের বাসাতেই নিয়ে এসেছে ও ।
তৃপ্তির রাগ উঠছে অন্য কারণে ।
জাফরকে ভালোবাসে ও । তবে নিজেও জানে এই ভালোবাসা একতরফা । জাফর সারাটা দিন একসাথে থাকলেও ভক্ত অথবা বন্ধুর সাথে যেভাবে কথা বলা উচিত তার বেশি বলে নি কিছুই । লেখক হলেও মানুষটা একেবারে নিপাট ভদ্রলোক ।
কিন্তু নদীর পাড় থেকে বাসা পর্যন্ত মাত্র আধ ঘন্টার দূরত্বে ছয়টা মেয়ে এসে অটোগ্রাফ নিয়ে গেছে রাস্তায় । তাও শরীরের বিভিন্ন স্থানে !
অসহ্যরকম বিরক্ত হয় তৃপ্তি । ছেলেটাকে যেন লুটে নেবে !
দেখতে পায় না ওর পাশে তৃপ্তি ছিল ?
বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে তৃপ্তি ।
রাগের জন্য বুঝতে পারে নি – হঠাৎই খেয়াল করে জাফর নেই আশেপাশে । গেল কোথায় ছেলেটা ?
অতিথিকে বাসাতে ঢুকিয়েই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে হয় নাকি ?
‘জাফর ?’ আস্তে করে ডাকে তৃপ্তি ।
ওর কথার জবাবেই যেন বাসাটার প্রতিটা লাইট নিভে গেল !
ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ের নিচে অসীম শূন্যতা অনুভব করে তৃপ্তি ।
বুনো জন্তুর মত ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে এই ঘরেই । আত্মা কেঁপে ওঠে তৃপ্তির ।
তবুও গলা শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলে, ‘জাফর ? কোথায় আপনি ? মজা করাটা কি ঠিক হচ্ছে ?’
জবাবে কেউ ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে । পুরুষালী একজোড়া হাতের শক্তির কাছে হার মানে তৃপ্তি ।
জাফর কি অন্ধকারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওর কাছ থেকে কিছু আদায় করে নিতে চাচ্ছে ?
ক্লিক জাতীয় একটা শব্দের সাথে দুইহাতে ধাতব স্পর্শ পেতেই ভয়টা ফিরে আসে তৃপ্তির মনে । জাফর ওর হাতে হ্যান্ডকাফ পড়াচ্ছে কেন ? বিকৃত যৌনাচারী ? পরক্ষণেই আরেকটা চিন্তা ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলে ।
লেখক জাফরকে সে কতটুকু চেনে মানুষ হিসেবে ?
গত বছর লেখক জাফরের বাসার কাছ থেকে মিথিলা নামের যে মেয়েটার লাশ উদ্ধার করা হয় সে ব্যাপারে ভোলে নি তৃপ্তি ।
প্রথম বইটা বের হয়ে গেছে – আর সেটা মাত্রাতিরিক্ত হিট । গোটা বাংলাদেশ জাফরের সাপোর্টে ছিল তখন । পুলিশ বাহিনীকে একেবারে হেনস্থা করে ছেড়েছিল জনতা মানী লোকের মানহানির চেষ্টা করায় ।
ওরা কি ভুল করেছিল ? খুনটা জাফরই করে নি তো ?
হাঁটুর নিচে একটা হাত চলে যায় তৃপ্তির । পাঁজাকোলা করে ওকে উঠিয়ে নিচ্ছে জাফর ।
হ্যান্ডকাফ পড়া তৃপ্তি আজ বাঁধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ।
অবসন্ন ভঙ্গীতে ও এলিয়ে পড়ে জাফরের দুই বাহুর মাঝে ।
*
চোখ ধাঁধানো তীব্র আলো চারপাশে ।
চোখ কুঁচকে তাকায় তৃপ্তি সামনে । একটা সিরিঞ্জের সুচের ফুটো – তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলা – এটুকুই ছিল ওর শেষ স্মৃতি । তবে সবই ছিল অন্ধকারে ।
এখন সামনে আলোতে হেঁটে বেড়াচ্ছে একজন মানুষ ।
চোখ কয়েকবার পিট পিট করে তৃপ্তি বোঝে জাফরই সেটা । তবে পরক্ষণেই নিজের অবস্থার প্রতি সচেতন হয় ।
ঘরের মাঝখানে প্রায় ঝুলে আছে ও ।
হাত দুটো ওপরে সিলিং থেকে ঝোলানো দড়িতে এভাবে বাঁধা যাতে হাত নামানোর কোন উপায় ওর নেই ।
পায়ের কাছেও দুটো আংটার সাথে শক্ত নাইলনের দড়ি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ওকে ।
‘জাফর, কি হচ্ছে এসব ?’
ফিরেও তাকায় না বিখ্যাত লেখক এই প্রশ্নে ।
‘জাফর ?’
এবার তাকায় অবশ্য । এগিয়ে আসে সামনে ।
‘আমাকে বলছেন ?’ বিনম্র কন্ঠের আগের জাফরকে ফিরে পেতে ভয় কিছুটা কমে তৃপ্তির ।
‘কি করছেন আপনি ? আমাকে নামান । জাফর, প্লিজ !’
‘কিন্তু ...’ একমুহূর্ত দ্বিধাগ্রস্থ দেখায় ওকে, ‘আমার নাম তো জাফর নয় !’
চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে তৃপ্তি ।
‘আমি মারুফ । মারুফ হায়দার । আমাকে জাফর কেন বলছেন ?’ প্রশ্ন করে যায় জাফর ।
তৃপ্তি এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে । এই মানুষটার ফেসবুক আইডি ‘জাফর আহমেদ’ । ব্লগে লেখে একই নামে । ম্যাগাজিনে তার লেখা বের হয় একই নামে । বই বের হয়েছেও জাফর আহমেদ নামে । তাহলে নিজের নাম কেন মারুফ হায়দার বলবে এখন ?
ঢোক গেলে তৃপ্তি । জাফরের মাথায় তাহলে সমস্যা আছে । লেখক মানুষ । একটু আধটু সমস্যা থাকতেই পারে ।
কিন্তু মিথিলার খুনী এর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি । তৃপ্তির বড় বড় চোখে ফুটে ওঠে ভয় । ওকে কথা বলিয়ে সময় নষ্ট করাতে হবে !
‘আমাকে কোথায় এনেছেন ?’ জানতে চায় তৃপ্তি ।
‘ও । এটা জানতে চান ? আমার বাসার বেজমেন্টে একটা গোপন ঘর আছে । সেখানেই আনলাম আপনাকে ।’ নম্র গলাতেই বলছে জাফর । স্বস্তি পাবে তৃপ্তি এতে – নাকি ভয় পাবে – বুঝে ওঠে না ও ।
‘আমাকে বাঁধন কেটে নামাবেন ? লাগছে খুব ।’ অনুনয় করে তৃপ্তি ।
‘নামানো তো যাবে না আপনাকে ।’
একেবারেই হঠাৎ ভয়ের সাগরে ডুবে যায় তৃপ্তি – জাফরের চোখের দিকে চোখ পড়োতেই । কি ঠান্ডা মাথাতেই না আছে লোকটা । সামনে একটা মেয়েকে হাত বেঁধে প্রায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে – এই দৃশ্যে ওর চেহারাতে কোন ভাবই ফুটে ওঠে না !
‘কি করবেন আমাকে নিয়ে ? ধর্ষণ করতে চান ?’
‘ধর্ষণ ? না । কি যে বলেন ? ছি ছি ।’ লজ্জা পেয়ে যায় জাফর ।
একটুও নিশ্চিন্ত হতে পারে না তৃপ্তি তবুও ।
জাফর ওর পেছনে চলে যাচ্ছে ।
ঘাড় ঘুরিয়ে যা দেখে তৃপ্তি – ওর হৃৎপিন্ডের গতি বেড়ে যায় তিনগুণ !
পেছনদিকের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা টেবিল । তাতে সুন্দর করে সাজানো আছে ছুরির এক বিশাল কালেকশন । সেই সাথে তৃপ্তির নাম না জানা বেশ কিছু অস্ত্র ।
জাফর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যাচ্ছে ওদিকে । একটা করে ছুরি তুলে নেয় আর নামায় ।
গানটা পরিচিত । ‘আমি বাংলায় গান গাই’ – এবং বাংলাতেই গাইছে জাফর ।
তৃপ্তি নিজের গাল বেয়ে গরম পানির অস্তিত্ব অনুভব করে । মুখে পড়তে নোনতা একটা স্বাদও পায় ও ।
কাঁদছে মেয়েটা ।
নিজের অসহায়ত্ব ছাপিয়ে যখন আবারও মুখ খোলে মেয়েটা – গলাটা ওর ভেঙ্গে গেছে ।
‘আমার কি দোষ ? আমার কি দোষ বলুন ?’
ছুরি দিয়ে তৃপ্তির চমৎকার আকাশী রঙের ফতুয়াটা পিঠ বরাবর কেটে দেয় জাফর । তারপর মুখ খোলে ।
‘ফেসবুকে তোমার স্ট্যাটাস আমি পড়েছি ।’
‘আপনি মানে কে ? জাফর আহমেদ না মারুফ রায়হান ?’
‘দুইজনই ।’ কথার ফাঁকে বক্ষাবরণীর পেছনের বাঁধন কেটে ফেলে জাফর ।
শিওরে ওঠে তৃপ্তি ।
‘প্লিজ, স্টপ ইট ! স্টপ ইট ফর গডস সেক ! প্লিজ ...’
মেয়েটার আকুতিতে কান না দিয়ে ফতুয়ার দুই কাঁধ কেটে ফেলে জাফর । আলগোছে পোশাক দুটো মাটিতে পড়ে যায় এবার ।
‘আপনার সব স্ট্যাটাস হিন্দীতে থাকে । কমেন্ট করেন হিন্দীতে । ব্যাপারটা কি বলবেন ? নিজের ভাষা কি ফেসবুক চালাতে যথেষ্ট বলে মনে হয় না ?’
জাফর এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায় অর্ধনগ্ন মেয়েটার । ওর চোখ ধিকিধিকি জ্বলছে ।
‘আমি লেখালেখি করি কেন জানেন ? খ্যাতির মূল্য আমার কাছে নেই । আমি শুধু চাই বাংলা ভাষাকে কিছু দিয়ে যেতে । সামান্য কিছু । আর আপনাদের মত মানুষদের আমার দেখা লাগে – যারা ইচ্ছে করে বাংলাভাষাকে অবহেলা করছে । হিন্দী বলে নিজের স্মার্টনেস প্রকাশ করছে !’
আর কিছু না বলে নিজেকে সামলে নেয় জাফর ।
আবার তৃপ্তির পেছনে চলে যায় । ফর্সা পিঠটাকে ও এখন একফালি সাদা কাগজ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছেনা ।
অথবা মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের একটা খালি পেইজ !
একটা বড় সাইজের কাঁচি তুলে এনে মেয়েটার দুই কাঁধের মাঝের চামড়াটা শক্ত করে ধরে জাফর । একটু টেনে এনে কেটে ফেলে চামড়াটুকু ।
কি আশ্চর্য ! কাটা মাত্র চামড়াটা বেশ ছোট হয়ে ওর হাতে চলে আসে ।
সেই সাথে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত ।
এবার একটা ফাঁকা জায়গা তো পাওয়া গেল ! ওদিক দিয়ে ছুরিটা ঢুকিয়ে দেয় জাফর । মেয়েটার ভেতরে কতটা হিন্দীপ্রেম লুকিয়ে আছে তা তো চিড়ে না দেখলে বোঝা যাবে না !
তৃপ্তি চিৎকার করছে অসহ্য যন্ত্রণায় ।
বাবা-মা পর্যন্ত একটিবারও ওর গায়ে হাত তোলে নি । তবে আজ জাফরের শো-টাইম ।
লাল রক্তগুলো তৃপ্তির ধবধবে পিঠটাকে ধীরে ধীরে লাল করে দিচ্ছে । এবার সেই রক্তে আঙ্গুল ডুবিয়ে তৃপ্তির সামনে আসে জাফর । হাতের আঙ্গুল দিয়ে ওর পেটে ধীরে ধীরে লেখতে চায় ‘বাংলাকে ভালোবাসি’ ।
কিন্তু হাতের আঙ্গুলে আর কফোঁটা রক্ত আসে ?
আবার পিঠের ক্ষতে হাত ডুবিয়ে দিতেই তৃপ্তির শরীর মুচড়ে ওঠে প্রচন্ড যন্ত্রণায় । তার মাঝেই পেটে বাকিটুকু লেখে ফেলে জাফর ।
‘প্লিজ ...’ গলা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে তৃপ্তির ।
জাফর বুঝতে পারে – এভাবে চললে যে কোন সময় জ্ঞান হারাবে মেয়েটা । হাতে বেশি সময় নেই । ওকে জ্ঞান হারাতে দেওয়া যাবে না ।
পিঠের দিকে চলে এসে ছোট মাপের একটা ছুরি এনে দ্রুত পিঠের চামড়া কেটে লেখতে থাকে ও, ‘হিন্দীকে ঘৃণা করি’ ।
তীব্র ব্যাথায় নিস্তেজ ভাবটা চলে যায় তৃপ্তির । ছটফট করে উঠে সোজা হতে চায় ও । কিন্তু হাত-পা যে বাঁধা !
জাফরও মহা বিরক্ত । এই ‘ঘৃ’ জিনিসটা এত পেঁচানো কেন ? মানুষের চামড়া কেটে লেখতে বেশ ঝক্কি দেখা যাচ্ছে ।
আর মেয়েটার চিৎকারও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে । অসহ্যরকম যন্ত্রণা করল দেখি এই মেয়ে ! শালী চুপ করে না কেন ? হিন্দী ভাষা নিয়ে পিএইচডি করার সময় কি মনে ছিল না এসব ?
ক্রোধে উন্মত্ত জাফর মেয়েটার পিঠ ঝাঁঝরা করে দিতে থাকে একের পর এক আঘাতে ।
চেঁচাতে চেঁচাতে গলা ভেঙ্গে যায় তৃপ্তির ।
তারপর আস্তে করে মাথা বুকে ঝুলে পড়ে ওর । রাত দশটার বাসটা আর ধরা সম্ভব হবে না ওর জন্য কোনদিনই !
এই সময় দরজাতে প্রচন্ড জোরে লাথি হাঁকায় কেউ ।
চমকে উঠে সেদিকে তাকায় জাফর । মুখে, চুলে রক্ত ।
পুলিশ এসে গেছে ?
*
ঘরটা থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই ।
ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে ফেলে জাফর ।
সকালের ফলো করতে থাকা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে ।
মাথা ঝোঁকায় জাফর । বুঝে গেছে সব ।
‘গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য ।’ বিড় বিড় করে বলে ও ।
ঠিকই শুনতে পায় মেয়েটা । মাথা নাড়ে শুধু একটু ।
‘তিন মিনিটের মাঝে বেড়িয়ে যেতে হবে তোমাকে , মারুফ । ইউ হ্যাভ অনলি থ্রি মিনিটস ।’
‘মানে ?’ বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জাফর ।
‘জেল বা ফাঁসী তোমার জন্য না মারুফ । বাংলা ভাষা তোমার কাছে আরও অনেক কিছু ডিজার্ভ করে । এই সময় থামতে পারো না তুমি । গেট লস্ট । ইমিডিয়েটলি ।’
‘তৃপ্তির বডিটা ... ’
‘মাগীকে আমি সামলাচ্ছি ।’ কথা শেষ করতে দেয় না ওকে মেয়েটা । টুক করে জাফরের ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে এগিয়ে যায় লাশটার দিকে । বাংলা ভাষার স্বার্থে আজ এখানে আরেকটা আত্মত্যাগ হবে ।
ছুটে বের হয়ে যায় মারুফ । মেয়েটাকে কেন জানি কিছুতেই মনে করতে পারে না ও । কোথায় দেখেছে ওকে ? আগে কোথায় দেখেছে ?
বাড়ি থেকে বেশ কিছুদূর চলে এসেছে জাফর – দেখতে পায় একঝাঁক পুলিশের গাড়ি তারস্বরে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলেছে ওর বাসার দিকে । একটা দীর্ঘশ্বাস চাপে জাফর । মেয়েটা বের হতে পেরেছে তো ?
ঝোপঝাড় ভেঙ্গে ছুটছে মারুফ হায়দার ।
বাবা-মায়ের আকিকা দেওয়া এই নামটা জনমন থেকে বিস্মৃত হয়েছে বহু আগেই । ফেসবুক আইডি খোলার সময় অল্পবয়েসে নামটা করে নিয়েছিল জাফর আহমেদ । সেই থেকে এই নামেই বেশি পরিচিত ও ।
ছুটতে ছুটতেই একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে জাফরের মুখে । পরের বইটার জন্য প্লট পেয়ে গেছে ও ।


তৃপ্তির সারা শরীরে যেখানে ইচ্ছা ছুরি গাঁথাচ্ছে ঋতু ।
বাড়ির চারপাশে পুলিশের হুইসেল শোনার পরও থামে না মেয়েটা । গাঁথিয়েই যায় ছুরিটা ।
মারুফ ছেলেটা কিভাবে কিভাবে যেন পাল্টে গেল ! লেখা নিয়ে অবসেশনে ভুগত ছেলেটা । আর ঋতুরও ঠিক পছন্দ ছিল না সময়গুলো ওকে না দিয়ে মারুফের লেখার পেছনে দেওয়ার ব্যাপারটা ।
অবশ্য যেই মুহূর্তে মারুফ জানতে পারে লেখক মারুফকে ঋতু চায় না – সেই মুহূর্তেই সরে দাঁড়ায় ওর জীবন ছেড়ে ।
বইমেলায় মারুফের প্রথম বইটা বের হওয়ার পর থেকেই নিজের ভুলটা বোঝে ঋতু । ছেলেটাকে সাপোর্ট দেওয়া উচিত ছিল । তাহলে হয়ত আজ মারুফ হায়দারকে জাফর আহমেদে পাল্টে যেতে দেখতে হত না ওকে ।
নিজের কোন সত্ত্বাটা কখন অ্যাকটিভ থাকে এটাই বোঝে না ছেলেটা !
পড়ে থাকা মেয়েটার ওপর সব ক্ষোভ আর রাগ ঝেড়ে ফেলতে চায় ঋতু একবুক অতৃপ্তি নিয়ে ।
হুড়মুড় করে বেজমেন্টে ঢুকে যায় ডিটেক্টিভ সাইফুদ্দীন । মাঝপথে লেখক ব্যাটা হুট করে কোনদিকে চলে গিয়েছিল ট্রেইল পান নি তাই দেরী হয়ে গেল । মনে মনে প্রমাদ গুনছিলেন তিনি – বেজমেন্টে ঢুকে অস্ত্র উঁচিয়ে দেখলেন ভয়টা সত্য ছিল ।
‘তুমি ?’ থমকে যান ডিটেক্টিভ সাইফুদ্দীন – আজ বিকেলেই যাকে কানা ফকিরের ছদ্মবেশে দেখা গেছিল নদীর তীরে । কিন্তু এখন সেসব মেকআপ নেই তাঁর মুখে ।
‘কে স্যার ?’ হঠাৎ থমকে যাওয়া বসের জন্য সামনের দিকটা দেখতে পাচ্ছে না সহকারী গোয়েন্দা রেদওয়ান ।
একটু সরে তাকে জায়গা করে দিতেই থমকে যায় তরুণ গোয়েন্দাও ।
তাদের ধারণা আগাগোড়াই ভুল ছিল । একুশে ফেব্রুয়ারী করা খুনদুটো লেখক জাফর আহমেদের ছিল না ।
খুনগুলো করেছে তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড ঋতু !
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় ডিটেক্টিভ সাইফুদ্দীন । হাতে হ্যান্ডকাফ ।
পেছন থেকে তাকে কাভার দেয় সহকারী রেদওয়ান ।
পুলিশ বাহিনীর লোকেরাও নেমে এসেছে বেজমেন্টে ।
একটু দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে ওরা ।
বিনা প্রতিবাদে হাতকড়া হাতে তুলে নেয় ঋতু ।
বাইরে বের হতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করে বলে শুধু, ‘বাংলাকে ভালোবাসি ।’
Read More »

সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!
ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।
ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।
আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion
ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।
আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি
করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।
মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!
এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।
Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!
নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।
Read More »

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
Read More »

শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

চোর

একবার এক চোরকে সামান্য ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির অপরাধে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল তখন সে চোর তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার সুযোগ চাইল
যখন তাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে আসা হলো তখন সে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলল, ‌'স্যার, আপনার সাথে দেখা করতে চাওয়ার একটাই কারণ তা হলো, আমার কাছে এমন একটা গাছের বীজ আছে যে গাছটা মনের সব ইচ্ছা পূরন করতে পারে। আমি আপনার জন্য এই গাছটা রোপণ করে দিয়ে যেতে চাই
প্রধানমন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার চারা লাগাতে কত দিন লাগবে?'
োর উত্তর দিল, 'এইতো স্যার, সাত দিন।'
Read More »