বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!
ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।
ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।
আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion
ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।
আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি
করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।
মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!
এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।
Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!
নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।
Read More »

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
Read More »

সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।
মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।
কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।
প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?


নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।
অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।
কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।
তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।
সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।
নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।
এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, Celegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।
আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।
সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।
নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।
সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।
আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

Read More »

মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৬

নারী কেন পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে

গড়পড়তা পুরো পৃথিবীতেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘ জীবনকাল উপভোগ করে। ডেভিড রেবসন নামে একজন লোক অনেক খেটেখুটে এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তার ভাষায়- যে মুহূর্তে আমার জন্ম হয়েছিল,সে মুহূর্ত থেকে আমার সাথে জন্ম নেয়া অর্ধেক শিশুর আগেই আমার মারা যাওয়ার নিয়তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা এমন এক অভিশাপ যা আমার এড়িয়ে যাবার কোনো অবকাশ নেই। এর কারণ? আমার লিঙ্গ। আমি পুরুষ হবার কারণে একই দিনে জন্ম নেয়া নারীদের তুলনায় প্রায় তিন বছর আগে আমার মৃত্যু হবে- পরিসংখ্যান এমনটাই বলছে।
কেন একজন ছেলে হবার কারণে আমি আমার সমবয়সী নারীদের তুলনায় আগে মারা যাব? এবং আমার কি এই লিঙ্গের অভিশাপ থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব? এই গোলমেলে বৈষম্যটি কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এর কিছু উত্তরে এসে পৌঁছেছে। একটি প্রাথমিক ধারণা হলো,পুরুষেরা নিজেরাই এর পেছনে দায়ী।
যুদ্ধে অংশ নিয়ে, খনিতে কাজ করে কিংবা জমিতে চাষ করে তারা তাদের প্রাণের উপর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। তবে, এটাই যদি মূল কারণ হয়ে থাকে তবে নারী পুরুষ উভয়কে মিলিতভাবে একই রকম পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে দিয়ে আমরা এ বৈষম্য দূর করতে পারি।

সত্যিকার অর্থে বিশাল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হলেও নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার এই বৈষম্য ঠিকয় বজায় থাকে। সুইডেনের কথাই ধরা যাক, এই দেশটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পেশ করে থাকে। ১৮০০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৩৩ বছর এবং পুরুষদের ৩১ বছর। বর্তমানে এটি যথাক্রমে ৮৩.৫ বছর এবং ৭৯.৫ বছর। এই দুই ক্রান্তিকালেই নারীরা দৃশ্যত পুরুষদের তুলনায় ৫ শতাংশ সময় বেশি বাঁচে।
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে- “পুরুষদের তুলনায় এই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বেঁচে থাকার সুবিধা নারীদের প্রাথমিক,বার্ধক্য এবং সম্পূর্ণ জীবনে; প্রতিটি দেশে,প্রতিটি বছর দেখা যায়। নারী পুরুষের মাঝে এটিই মনে হয় সবচেয়ে ক্লাসিক বৈষম্য।
এটাও দাবী করা যায় না যে, পুরুষেরা তাদের শরীর তথা জীবনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম যত্নশীল। ধূমপান,মদ্যপান এবং অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের মতো বিষয়গুলো হয়তো ব্যাপারটাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এটাই চূড়ান্ত কারণ নয়। রাশিয়াতে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা ১৯ বছর আগে মারা যায়,আংশিকভাবে যার কারণ অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নারী শিম্পাঞ্জি, নারী গরিলা এবং নারী ওরাংওটাংরাও তাদের প্রজাতির পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। আপনি কি কখনো কোনো শিম্পাঞ্জি,গরিলা কিংবা ওরাংওটাংকে সিগারেট বা মদের গ্লাস হাতে দেখেছেন? না।
এটা বোঝা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের আয়ু সংক্রান্ত উত্তরটা আমাদের বিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। “অবশ্যই সামাজিক এবং জীবনভিত্তিক বিষয়গুলো আয়ুর উপর প্রভাব ফেলে,কিন্তু তার চেয়েও গভীর কিছু রয়েছে আমাদের পরস্পরের জীববিজ্ঞানের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ইউরোপের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক টম কার্কউড।
জীববিজ্ঞানের অনেক বিষয় এর পেছনে কাজ করে। গুচ্ছ-ডিএনএ দিয়ে শুরু হোক। এরা প্রতিটি কোষের মধ্যে যা ক্রোমোসোম হিসেবে পরিচিত। ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে,এবং নারীদের দুটি X ক্রোমোসোম, পুরুষদের একটি X ও একটি Y। ক্রোমোসোম সংক্রান্ত এই পার্থক্যটি খুব চতুরভাবে কোষের বয়স পরিবর্তন করে দিতে পারে। যেহেতু নারীদের প্রতি কোষে দুটি X ক্রোমোসোম রয়েছে, তাই তাদের প্রতিটি জিনের অনুলিপি থাকে,অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত একটি থেকে যায়,যদি অপরটি কাজ না করে অথবা নষ্ট হয় তখন কাজে লাগে। পুরুষদের বেলায় এমন বিকল্প কিছু নেই।
নারীদের মতো কোনো বিকল্প না থাকার কারণে ফলাফল স্বরূপ অনেক কোষই সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে যাবার সম্ভাবনায় থাকে। এতে পুরুষদের রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অন্যান্য বিকল্প বিষয়গুলোর মধ্যে ‘ব্যায়ামকারী নারীর হৃদপিণ্ড’ (jogging female heart) হাইপোথিসিস। এর ধারণাটি হলো, একজন নারীর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে রজচক্রের দ্বিতীয় অর্ধাংশে,যা পরিমিত ব্যায়ামের মতই উপযোগী। এবং এই প্রক্রিয়াটি হৃদপিণ্ডজনিত যেকোনো রোগ হবার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
অথবা হতে পারে আকৃতিগত কোনো সহজ ব্যাপার। লম্বা মানুষদের শরীরে কোষের সংখ্যা বেশি,এই ধরনের কোষগুলো ক্ষতিকরভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তুলনামূলকভাবে বড় শারীরিক গঠন অধিক পরিমাণ শক্তি দহন করে। যেহেতু পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে প্রায়ই লম্বা হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের আরো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত টেস্টোস্টেরনের মাঝে নিহিত আছে, যা অধিকাংশ পুরুষদের পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। গভীর কণ্ঠস্বর, লোমশ বুক হতে শুরু করে নিরাভরণ টাক মাথা পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য টেস্টোস্টেরন দায়ী।
কোরিয়ার Court of the Chosun Dynasty থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি কোরিয়ান বিজ্ঞানী হান নাম পার্ক উনিশ শতাব্দী থেকে কোর্ট লাইফ রেকর্ডগুলো বিশ্লেষন করেন,তার মধ্যে ৮১ জন নপুংসকও ছিল। যাদের বয়ঃসন্ধির আগেই শুক্রাশয় অপসারণ করে ফেলা হয়। তার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ঐ নপুংসকেরা ৭০ বছরের মতো আয়ু পেতো, যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক পুরুষেরা আয়ু পেতো গড়ে ৫০ বছর। তাদের ১০০ তম জন্মদিন পালনের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। এমনকি ঐ সময়ের রাজারাও এমন আয়ুর কাছাকাছি আসতে পারতো না।
যদিও শুক্রাশয় নিয়ে অন্য সব গবেষণা আয়ু নিয়ে এমন পার্থক্য দেখায় না। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শুক্রাশয় ছাড়া পুরুষ মানুষ ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীরা বেশিদিন বেঁচে থাকে।
আয়ুর পার্থক্যের সঠিক কারণগুলো এখনো অধরা। তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডেভিড জেমস মনে করেন করেন, এই ক্ষতি হয়তো বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হয়ে যাবার কারণেই হয়। তার দাবী প্রমাণের জন্য তিনি মানসিক রোগীদের কিছু বিষন্ন কেস উপস্থাপন করেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই রোগীদেরকে নপুংসকে পরিণত করতে হয়। কোরিয়ান নপুংসকদের মতো তারাও অন্যান্যদের চেয়ে অনেকদিন বেশি বেঁচে ছিল। উল্লেখ্য তাদের ১৫ বছরের আগেই খোঁজাকৃত করা হয়। টেস্টোস্টেরন হয়তো পুরুষের শরীরকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই পরিবর্তন তাদের হৃদপিণ্ডজনিত রোগ সহ অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।
উদাহারণসরূপ বলা যায়, টেস্টোস্টেরন হয়তো আমাদের দেহে সেমিনাল ফ্লুইডের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, কিংবা হৃদপিণ্ডের সংবহনন্তান্ত্রিক ক্রিয়া পরিবর্তন করে দিতে পারে যা প্রথম দিকে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করলেও পরবর্তীতে উচ্চ-রক্তচাপ, অথেরোস্ক্লেরোসিসের জন্ম দিতে পারে। এমনটাই বলেন জনাব জেমস।
নারীরা শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরনের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত নয়, পাশাপাশি তারা আরো সুবিধাও পায়। তারা নিজেদের “যৌবনের স্পর্শমণি” (elixir of youth) থেকেও সুবিধা পায়, যা তাদের ভবিষ্যতের ভয়াবহতাগুলো থেকে সহজে উৎরে যেতে সাহায্য করে। নারীর সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন একটি “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”,যা কোষে চাপ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থদের বিতাড়িত করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এটা কার্যকর। প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি হলে কিংবা যারা ইস্ট্রোজেন স্বল্পতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা বেশিদিন বাঁচে না। ঠিক বিপরীতটি ঘটে পুরুষ নপুংসকদের ক্ষেত্রে।
নপুংসকতাকে দূরে ঠেলে বংশগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এমনটি ঘটে থাকে। এ হিসেবে পুরুষের সামান্য স্বল্প আয়ু মানুষ তথা পুরো প্রাণিজগতকে বিবর্তনীয় উপযোগীতা প্রদান করে। কিছু পার্থক্য নারী-পুরুষ উভয়কেই টিকে থাকতে সাহায্য করে। মিলনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রধানত অধিক পরিমাণ পুরুষালী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তথা অধিক পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নিঃসরণকারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে করে আয়ু বৈষম্যের ধারাও অধিক হতে থাকে। চাইলেও সহজ কিছু প্রচেষ্টা কিংবা উদ্যোগ দিয়ে এটা দূর করা সম্ভব নয়।
যদিও ব্যাপারটি পুরুষের ভালো লাগার কথা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর একটি সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে। কার্কউডের মতে- হরমোন সহ অন্যান্য নিয়ামক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতে পারে, এই অর্জিত জ্ঞানই আমাদের দীর্ঘ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

Read More »